হিন্দু ধর্মস্থান ধ্বংসই ছিল লক্ষ্য! হামলা করেছিলেন পুরীর মন্দিরেও, কে ছিলেন কালাপাহাড়?

By | May 27, 2022


বিশ্বদীপ দে: ইতিহাসের সঙ্গে বহু সময়ই মিশে যায় কিংবদন্তি। সেই কুয়াশার ভিতরে যে সব কাহিনির জন্ম হয়, তা যেন হার মানায় গল্পকাহিনির রোমাঞ্চকেও। তেমনই এক চরিত্র কালাপাহাড়। শতকের পর শতক পেরিয়েছে। পৃথিবী চক্করের পর চক্কর কেটে আরও বুড়ো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কালাপাহাড়ের (Kalapahad) কাহিনিতে মরচে পড়েনি। বঙ্গদেশ ও ওড়িশার নানা প্রান্তে ছুটে বেড়ানো ‘জীবন্ত বিভীষিকা’ কালাপাহাড়ের লক্ষ্যই ছিল মন্দির-দেউল ভেঙেচুরে হিন্দুদের মধ্যে সীমাহীন ত্রাসের সঞ্চার করা। আজও সেই আতঙ্কের চোরাস্রোত টের পাওয়া যায় ইতিহাসের ভারতবর্ষের বুকে কান পাতলে।

কিন্তু কে ছিলেন কালাপাহাড়? কেনই বা তাঁর মধ্যে জন্ম নিল এমন ভয়ংকর হিংসা? ‘মার্শম্যানস হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল’ বই থেকে জানা যাচ্ছে, ‘জন্মগত ভাবে কালাপাহাড় ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ। কিন্তু গৌড়ের রাজকন্যার প্রেমে পড়ে তিনি ধর্মান্তরিত হন। আর এর পর থেকেই নিজের আগের ধর্মের প্রতি নৃশংস অত্যাচারী হয়ে ওঠেন।’

কোনারকের মন্দিরও বাজ পড়েনি কালাপাহাড়ের রোষ থেকে

[আরও পড়ুন: লাদাখের তুরতুক সেক্টরে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, নিহত কমপক্ষে ৭ সেনা জওয়ান]

শুরু থেকে শুরু করা যাক। শ্রীঅশ্বিনীকুমার গোস্বামী তাঁর ‘আসল কালাপাহাড়’ বইয়ে লিখেছেন, ‘কেউ বলেন, রাজা গণেশ, প্রসিদ্ধ সংস্কৃত গ্রন্থ কুসুমাঞ্জলি প্রণেতা উদয়নাচার্য এবং আরও অনেক বিখ্যাত পুরুষ একটাকিয়ার যে ভাদুড়ী বংশে জন্মগ্রহণ করেন, কালাপাহাড়ও সেই বংশের ছেলে। কারও কারও মতে কালাপাহাড়ের আসল নাম নাকি কালাচাঁদ রায়। রায় এঁদের রাজদত্ত উপাধি।’ মতান্তরে এও শোনা যায়, তাঁর আরেক নাম রাজীবলোচন রায়। ডাকনাম রাজু। আজকের বাংলাদেশ, সেকালের পূর্ববঙ্গের রাজশাহির বীরজাওন গ্রামেই নাকি থাকতেন এই কালাচাঁদ ওরফে রাজীবলোচন। তিনি অত্যন্ত রূপবান ছিলেন। এবং ছিলেন রীতিমতো সুশিক্ষিত।

বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের কালাচাঁদের বাবা নয়ানচাঁদ রায় ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। বিষ্ণুর উপাসক। সেই সময় বাংলার মসনদে সুলতানি শাসকরা। গৌড় বাদশাহের ফৌজদার হিসেবে কাজ করতেন নয়ানচাঁদ। কিন্তু তিনি অকালেই প্রয়াত হলে মায়ের কাছেই বড় হন রাজু। সেই সময় গৌড়ের শাসক সুলায়মান খান কররানি। বিশ্বনাথ ঘোষের ‘আমার নাম কালাপাহাড়’ বইয়ে সুলায়মান সম্পর্কে বলা হচ্ছে, ‘কররানি শুধুমাত্র একজন দুর্ধর্ষ অকুতোভয় যোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি একজন ধর্মোন্মাদ প্রকৃতির ব্যক্তিও ছিলেন।… সেটা রাজতন্ত্রের যুগ।

[আরও পড়ুন: ‘অতিরিক্ত লোভ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষাই শেষ করে দিল মেয়েকে’, আক্ষেপ মঞ্জুষার মায়ের]

স্বৈরাচারী সুলায়মান ছিলেন সুরামত্ত, নারীপ্রিয়, গোঁড়া মুসলমান।’ এও বলা হয়েছে, একশো পঁচিশটি নারীকে নাকি তিনি তাঁর হারেমে বন্দি করেছিলেন। এহেন বাদশাহের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন রাজীবলোচন। একদিকে যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষতা, অন্যদিকে কূটনৈতিক দূরদর্শিতা- এই দুইয়ে মিলে অচিরেই পদোন্নতি হতে থাকে তাঁর। কেননা সুলায়মানের অভিজ্ঞ চোখ চিনে নিয়েছিল তাঁকে। এরপরই তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয় রাজীবলোচনের।
তবে এই মতটাই সর্বজনগ্রাহ্য এমনটা নয়। অন্য একটা মতের দাবি, প্রথম থেকেই কররানির বাহিনীতে ছিলেন না রাজীবলোচন। তিনি ছিলেন কলিঙ্গের রাজা গজপতি মুকুন্দ দেবের সেনাপতি। পরে কররানির সঙ্গে যুদ্ধে তিনি জয়ী হলে সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতেই রাজা পাঠান রাজীবলোচনকে।

যাই হোক, যে মতই সত্য়ি হোক, সুলায়মান কররানির সঙ্গে সাক্ষাৎটি সত্য়িই হয়েছিল। আর তখনই তিনি দেখতে পান সুলতানের কন্যাকে। সেই রূপবতী রাজকুমারীকে দেখেই তাঁর প্রেমে পড়ে যান রাজু। এবিষয়েও ভিন্ন মত রয়েছে। সেই মত অনুযায়ী, কররানি নিজেই ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন তাঁরই মেয়েকে। এমনও মত রয়েছে, রাজীবলোচন প্রেমে পড়েননি। তাঁরই প্রেমে পড়েছিলেন সুলায়মান-কন্যা। তিনিই নাকি তাঁর বাবাকে গিয়ে তাঁর পছন্দের কথা বলেন। আসলে ইতিহাসের ভিতরে কিংবদন্তি মিশে গেলে এভাবেই নানা রকম কাহিনি সূত্র তার জাল বিস্তার করতে থাকে।

Kalapahad
শিল্পীর কল্পনায় কালাপাহাড় ও তাঁর স্ত্রী

যাই হোক, কররানির কাছে গিয়ে তাঁর মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন রাজীবলোচন। জবাবে সুলতান সটান জানিয়ে দিলেন, এই বিয়েতে তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু বিয়ে করতে হলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে রাজীবকে। তাই হল। তাঁর নতুন নাম হল মহম্মদ ফারমুলি। রাতারাতি তিনি হয়ে উঠলেন সেনাপতি বা মনসবদার।

এরপর গৌড়ের বাদশাহের সেনাপতি রাজু ওরফে কালাচাঁদ ফিরলেন নিজের বাড়িতে। তাঁর মা কিন্তু মেনে নিয়েছিলেন ছেলের এই বিয়ের বিষয়টি। রসিকচন্দ্র বসুর ‘কালাপাহাড়’ বইয়ে পাচ্ছি, কালাচাঁদের মা বলছেন, ‘কেন বাবা? আমাদের পুরাণ ইতিহাসে এইরূপ বিবাহে দোষ ধরে না। স্বয়ং ভগবান নরক অসুরের কন্যা বিবাহ করিয়াছিলেন।… শুনিয়াছি, শাস্ত্রে নাকি রাজাকে দেবতা বলে। রাজার আবার জাতি কী? এ বিবাহ গর্হিত হয় নাই।’

কিন্তু মা মেনে নিলেও সমাজ মানল না। অচিরেই কালাচাঁদ ওরফে রাজীবলোচন বুঝতে পারলেন, হিন্দু সমাজে আর তাঁর স্থান নেই। এই ক্রোধ থেকেই ভিতরে ভিতরে বদলে যেতে লাগলেন তিনি। এমনকী, তিনি নাকি প্রায়শ্চিত্তও করেছিলেন। কিন্তু তবুও পরিস্থিতি বদলাল না। রসিকচন্দ্রের লেখায় রয়েছে, শেষ পর্যন্ত মন্দিরে প্রবেশাধিকার না পেয়ে রাজীবলোচন মন্দিরের সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলেন। প্রার্থনা করতে শুরু করলেন ঈশ্বরের কাছে। এইভাবে তিন দিন কাটল। চতুর্থ দিন খিদে, ক্ষোভ, অপমানে অস্থির হয়ে গেলেন তিনি। ‘চতুর্থ দিন প্রাতে কালাচাঁদ উঠিয়া বসিলেন, উচ্চস্বরে কহিলেন, যে ধর্মে অনুতাপীর আশ্রয় নাই, হৃদয়ের আদর নাই, পবিত্রতার পুরস্কার নাই, উহা ধর্ম নহে, বাহ্য কপটাচার মাত্র।… প্রতিজ্ঞা করিলাম, এই বাহ্যাচার সারমাত্র প্রবঞ্চনাময় পৌত্তলিকতা এবং এই ভণ্ডগণের কপট সমাজ ধ্বংস করিব।’

কালাচাঁদ ওরফে রাজীবলোচন ওরফে রাজু এরপরই হয়ে উঠলেন কালাপাহাড়! শুরু হয় অকথ্য ধ্বংসলীলা। শ্রীঅশ্বিনীকুমার গোস্বামীর লেখায় পাই, ‘তিনি ভেঙেছিলেন অসংখ্য মন্দির, দেউল, চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছিলেন লক্ষ লক্ষ বিগ্রহ, কলুষিত করেছিলেন হিন্দুর পবিত্র তীর্থস্থান সকল।’ ১৫৬৮ সালে তিনি কোনারক সূর্যমন্দিরে আক্রমণ করেন। বলা হয়, মন্দিরের শীর্ষে ও ভূমিতে থাকা চুম্বক নাকি চুরি করে নিয়ে যায় কালাপাহাড়। পুরীর জগন্নাথ ধামেও হামলা চালিয়েছিলেন তিনি। সুভদ্রা ও জগন্নাথ মন্দিরের কাঠের প্রতিমাও নাকি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন কালাপাহাড়! অসমের কামাখ্যা মন্দির, ময়ূরভঞ্জের মন্দির ও মেদিনীপুর মন্দির থেকে শুরু করে এই তালিকা রীতিমতো দীর্ঘ। উন্মত্তপ্রায় কালাপাহাড়ের ক্ষোভের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিল এমন মন্দির নাকি সেযুগের বাংলা, উড়িষ্যা ও অসমে কমই ছিল। একমাত্র সম্বল পুরের মন্দিরের পুরোহিতরা নাকি সুকৌশলে এই হামলার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।

এই হল কাহিনি। এর ভিতরে কতটা ইতিহাস, কতটা কিংবদন্তি বলা মুশকিল। সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানে কত লোকশ্রুতিও হয়তো মিশেছে, কে তার হিসেব রাখে। যে কালাপাহাড় ১৫৮০ সালে মোঘলদের গোলায় প্রাণ হারান, তিনি ছাড়াও আরও এক কালাপাহাড় ছিলেন বলে দাবি করেন কেউ কেউ। আবার আরও মত রয়েছে, যুদ্ধে মারা যাননি কালাপাহাড়। শেষ জীবনে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাত-পা খসে গিয়ে দগ্ধে দগ্ধে মৃত্যুর কবলে ঢলে পড়েছিলেন তিনি। আবার রোম্যান্টিক মিথও রয়েছে। কেদারেশ্বরের বিগ্রহে বিলীন হয়ে যাওয়া কিংবা দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গাগর্ভে ডুব দিয়ে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া। তবে কালাপাহাড় নিয়ে যতই মত থাক, তাঁর ধ্বংসলীলা নিয়ে সকলেই একমত। অতীতের কালো অধ্যায় হয়ে রয়ে গিয়েছেন কালাপাহাড়। ধর্মান্ধতা যে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু আর ধ্বংস ছাড়া আর কিছু দেয় না, এই সত্যই যেন মনে করিয়ে দিতে থাকে কালাপাহাড়ের কিংবদন্তি। তার যত টুকুই সত্যি হোক, তা যে ভয়ংকর, এই নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে না।

Sangbad Pratidin News App: খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

নিয়মিত খবরে থাকতে লাইক করুন ফেসবুকে ও ফলো করুন টুইটারে





Source link